চা বাগানের মাঠে স্বপ্নের লড়াই ফুটবলে মেয়েদের আত্মবিশ্বাসের জয়

২০২১ সালে শুরু হওয়া উইমেনস সেফটি অ্যাক্সিলারেটর ফান্ড (WSAF) কর্মসূচির লক্ষ্য হলো চা শিল্পে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (GBV) প্রতিরোধ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারীর প্রতি সহিংসতা (VAW) শনাক্তকরণ, নথিভুক্তকরণ ও প্রতিকারের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা । এই কর্মসূচির আওতায় আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু ও কেরালার ৩০০টিরও বেশি চা বাগানে ম্যানেজমেন্ট, কর্মচারী, শ্রমিক এবং কিশোর-কিশোরীদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে, যাতে মহিলা ও মেয়েদের  জন্য আরও নিরাপদ চা বাগান ও সম্প্রদায় গড়ে তোলা যায়।

এই কর্মসূচীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা—এর জন্য চা বাগানগুলিকে জেলা সমাজকল্যাণ দপ্তর, জেলা আইনগত পরিষেবা কর্তৃপক্ষ এবং জেলা-স্তরের হেল্পলাইনের মতো সরকারি অংশীদারদের সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন অংশীজনের পরিদর্শনের মাধ্যমে উপলব্ধ পরিষেবা ও সেগুলিতে পৌঁছনোর পথ সম্পর্কে সচেতনতা ও প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পেয়েছে।

WSAF চা বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে, যাতে নারীর প্রতি সহিংসতা (VAW) শনাক্তকরণ, নথিভুক্তকরণ ও প্রতিকারের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন (POSH Act) সহ প্রাসঙ্গিক আইনি পরিকাঠামো সম্পর্কে কর্মীদের এবং  কর্তৃপক্ষের ধারণা বাড়ানো যায়।

একই সঙ্গে, WSAF সম্প্রদায়ভিত্তিক পরিবর্তনের দূতদের—যেমন, মহিলা নেত্রী ,কিশোরী ও কিশোর, এবং যুব নেতাদের—চিহ্নিত করে তাঁদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। এই পরিবর্তনকর্মীরা প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন এবং খেলাধুলা, নাটক, পোস্টার, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ও ঝুমুর নৃত্যের মতো সাংস্কৃতিক মাধ্যম ব্যবহার করে, কমিউনিটি বৈঠকের মাধ্যমে শেখা বিষয়গুলি ভাগ করে নেন। এই কর্মসূচীর মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে:

  1. চা বাগানের মেয়েদের অদৃশ্য স্বপ্ন দৃশ্যমান হচ্ছে
    প্রান্তিক চা বাগান এলাকায় বেড়ে ওঠা মেয়েরা ফুটবলকে নিজের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে।
  2. সমান সুযোগ পেলে মেয়েরাও পারে
    সামাজিক বাধা, ভয় ও আত্মবিশ্বাসের সংকট পেরিয়ে মাঠে নেমে মেয়েরা তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
  3. কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ পরিবর্তনকে প্রভাবিত করে
    পুরো কমিউনিটির অংশগ্রহণ দেখিয়েছে—পরিবর্তন একা নয়, সম্মিলিতভাবেই সম্ভব।
  4. ফুটবল লিঙ্গসমতার কার্যকর হাতিয়ার
    খেলাধুলা নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার বার্তা বাস্তবভাবে পৌঁছে দিতে পারে।

ফুটবলের প্রতিটি কিক দেয় জীবনে শক্তি ,প্রতিটি পাসে তৈরি হয় জীবনের লক্ষ্য ও এগিয়ে চলার পথ, প্রতিটি গোল দেয় লক্ষ্যে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা। ফুটবল মাঠে পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ানো শেখায় আবার শেখায় প্রতিটি পরাজয়ের পর কিভাবে নতুন ভাবে জয় ছিনিয়ে আনতে হয়। তাই ফুটবল শুধু একটা খেলা নয় , ফুটবল দেখায় জীবনে এগিয়ে চলার রাস্তা । ফুটবল আমাদের শেখায় জীবনে খেলো দলবদ্ধ হয়ে।, নারী – পুরুষ নির্বিশেষে। যেখানে ঐক্য, সেখানেই জয়।

এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গের চা বাগানগুলোতে—যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরিবারগুলো বসবাস ও কাজ করে এসেছে, অনেক সময় সমাজের মূল স্রোতের আড়ালে থেকে সব কিছু করে ওঠা হয়নি, সামাজিক বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে।

এই সব কিছুর মাঝে বাগানের মেয়েরা এগিয়ে যেতে চায় তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে।       চা বাগান শুধু জীবিকার স্থান নয়, এখানে ছেলে-মেয়েদের চোখে  জন্ম নিচ্ছে নতুন স্বপ্ন । এই বাগানের ছেলে-মেয়েরা ফুটবলকে বিনোদনের বাইরে নিজের আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে। সামাজিক বাধা, সুযোগের অভাব ও আত্মবিশ্বাসের সংকট পেরিয়ে তারা এগিয়ে যেতে চাইছে ।

এই বাস্তবতা বদলাতে তাই তাদের জন্য তেমনই এক পরিবর্তনের মুহূর্ত, ১৬ দিনের অভিযানের কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫; জলপাইগুড়ি ,কালিম্পঙ এবং আলিপুরদুয়ার জেলার ৯ টি চা বাগানে ফুটবল টুর্নামেন্ট এর আয়োজন করা হয়েছিলো। যার লক্ষ্য ছিল ছেলে ও মেয়েদের আওয়াজ দৃঢ় করা ও স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে দেওয়া। যেখানে মেয়েরা এই ফুটবল টুর্নামেন্টে মাঠে নেমে ভয় কাটিয়ে সাহস ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দেয়। এই টুর্নামেন্টে পুরো কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায়। প্রতিটি পাস ও গোলের চেষ্টায় মেয়েরা প্রমাণ করে—সুযোগ পেলে তারাও পারে। ফাইনালে ট্রফি জিতবে একটি দল, তবে প্রকৃত জয় ছিল আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্নের। আজ এই চা বাগানগুলির প্রতিটি মাঠ একটি সম্ভাবনার প্রতীক, যেখান থেকে মেয়েদের নতুন যাত্রা শুরু হয়।

ফুটবলের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা, মর্যাদা ও অধিকারকে অর্থবহভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়। এই কর্মসূচি প্রমাণ করে যে খেলাধুলার আঙ্গিকে কীভাবে সচেতনতাকে আরো গতিশীল করা যায় । এই গল্প আসলে নারীর শক্তি, জ্ঞান আর সম্মিলিত প্রচেষ্টার গল্প—যেখানে পরিবর্তনের বীজ বোনা হচ্ছে প্রতিদিন, নীরবে কিন্তু দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে।

ভয় নয়—ভয় নয়, মাঠে নামার সাহস চাই,
অবহেলা নয়, খেলায় সমান সুযোগ যেন পাই।
চা বাগানের পথে, ঘামে-স্বপ্নে গড়া জীবন,
বল পায়ে মেয়েরা আজ, বদলাচ্ছে নিয়ম।

মাঠে নামুক তারা, চোখে জয়ের আলো,
ছেলে-মেয়ে পাশাপাশি—একসাথে চলো।
হাত ধরাধরি করে, ভাঙুক সব বাধা,
অন্ধকার ছিঁড়ে আসুক নতুন প্রত্যাশা।

অপমান নয়— মেয়েরা খেলায় অধিকার চায়,
মেয়েদের শক্তিতে আজ মাঠ কাঁপায় ।
ফুটবল হোক তাদের আত্মবিশ্বাসের ভাষা,
চা বাগানের মেয়েরা— আজ এগিয়ে চলার আশা।

মেয়েরা লড়ে—ছেলেরা থাকুক পাশে,
উৎসাহে, সম্মানে, একই বিশ্বাসে।
মাঠে উঠুক প্রতিটি কণ্ঠের ডাক,
“আমরাও পারি”—এই হোক আজকের স্লোগান।

নিরাপদ হোক মাঠ, নিরাপদ হোক মন,
নারী-পুরুষ মিলেই গড়ি আগামীর ক্ষণ ।
ভয় নয়—ভয় নয়, সম্মান চাই,
চা বাগানের মেয়েরা আজ—ফুটবলে পরিচয় পাই।

 

Author : Gautam Sen