মায়াবী কোরাপুট

পাহাড় ঘেরা, ঝর্না, নদী, আদিবাসী মানুষের নাচ গান। এটাই কোরাপুট, যেখানে পাহাড় কথা বলে, ঝর্না গায় গান, আর বিভিন্ন জনজাতির ইতিহাস লুকিয়ে আছে বিভিন্ন গ্রামে। মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হয় অকারণ। অজান্তে এক গুচ্ছ মেঘ এসে ঢেকে দেয়, শুরু হয় বৃষ্টি।
অঙ্ক মেলে না এখানে। যখন মনে হয় এই বুঝি পথ শেষ, আর একটা পথ শুরু হয়। কোমরে হাত দিয়ে রমণীরা গায় জীবনের গান, পুরুষ বাজায় নানান রকমের যন্ত্র। জঙ্গল থেকে বিভিন্ন শাক, কচু জোগাড় করে আনে, সেটাই তাদের মূল খাদ্যাভ্যাস। সঙ্গে থাকে সলপ, মহুয়ার মত, এখানকার মানুষের দুঃখ ভুলে থাকার পানীয়। বছরে একবার তারা শিকারে যায়। পুরো গ্রাম তখন মেতে ওঠে আনন্দে। এক সপ্তাহ শিকারের পর পুরো গ্রাম মিলে সেই খাবার উপভোগ করে। জীবন যাত্রা বেশ কঠিন। পথ খুজতে খুজতে তুমি পথ হারিয়ে যেতে পারো। বিশাল বনাঞ্চলের মাঝে তাদের বাস। ছোট ছোট বাড়ি, মাটি দিয়ে লেপা, মাঝে উঠোন, মাটির কড়াই, হাড়ি, উনন। মাটির দ্রব্য হাট থেকে কেনা। সব গ্রামের আসেপাশে কুমরদের গ্রাম আছে। তারা মাটির বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজের দরকারি দ্রব্য বানায়। আর হাটে গিয়ে বেঁচে দেয়। হাটে দরকারি সব জিনিস পাওয়া যায়। জামা কাপড়, শাড়ি, চুড়ি, জুতো, আলতা, সবজি, ফল, মাছ, মাংস, বাঁশের দ্রব্য, হাঁস, আরও কত কি।। যা লাগবে তাই পাবে। আর একদিকে কোনায় কিছু পুরুষ পান করে মহুয়া, সলপ আর সঙ্গে পাবে ছোলা সেদ্ধ। এমন এক হাট অনুকাডেলি হাট, দুদুমা জলপ্রপাত থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত। এখানে বন্ডা উপজাতির মানুষ বাজার করতে আসে । তাদের সারা শরীরে গয়না। গলায় হার, বিভিন্ন রঙের। আগেকার দিনে তারা কাপড় পড়তো না, গয়না দিয়েই ঢাকা থাকতো শরীর। আর তারা পড়তো কেরাং গাছের ছাল থেকে তৈরি শরীরের অপরের অংশের জন্য এক টুকরো কাপড়। কেরাং গাদাবা জনজাতির লোকেরাও পড়ে। তাদের কাপড়ের রং আলাদা, আলাদা তাদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ।
গাডাবা জনজাতি মুখে ট্যাটু করতো। তাদের কথায় আগেকার দিনে সুন্দরীদের রাজাদের অত্যাচারের শিকার হতে হত। তাই ট্যাটু করে তারা তাদের রূপ লুকিয়ে রাখতে। গাদাবা জনজাতি গোদাভরির তীরে বাস করতো, তাই তাদের নাম গাডাবা বা গদাবা। দুরুয়া আর এক জনজাতি ছত্তিশগড় থেকে এসছিল বলে শোনা যায়। সবরী নদীর এক পারে কোরাপুট আর অন্যদিকে ছত্তিশগড়। অনেক রকমের ধান চাষ হয় এখানকার মাটিতে, সাথে বেশ প্রসিদ্ধ মিলেট, আর কফি। অনেক রকমের গল্প লুকিয়ে আছে এক এক আদিবাসীর জীবন যাত্রায়। খুব কম বয়সেই মেয়েদের বিয়ের চল এখানে। পরিবার দেখে দেবার চল যেমন আছে, পালিয়ে গিয়ে বিয়ের চল ও আছে। তবে মেয়েদের এখানে প্রাধান্য বেশি। ছেলের পক্ষ মেয়ে পক্ষকে তত্ত্ব দেয়। বিধবা হলে বিয়ের সম্মতি আছে। এখানকার মানুষের সরল জীবন। কোনো বাধা নেই।
তবে বেশিরভাগ মানুষের পরিসর খুব ছোট। গ্রাম, হাট, আশপাশের পরিবার, বড়জোর হলে কাছের টাউন। ট্রেনে চড়ে প্রথমবার যখন গ্রামের মেয়েরা তাদের শিল্প সংস্কৃতি দেখাতে বাইরে বেড়োয় তখন অবাক চোখে দেখে এক নতুন পৃথিবী। প্রথমবার ট্রেন, শহরের রাস্তা। ঝকঝকে মলে তারা হারিয়ে যায়। এস্কেলেটর দেখে ভয় পায়। তবে তাদের নাচ গান শুরু হলে মানুষের মন নেচে ওঠে। বৃষ্টির গান, চাষের গান, জীবন যাত্রার গান। বাংলানাটক ডট কম কোরাপুটের বিভিন্ন গ্রামে কাজ করে চলেছে। পুরোনো দিনের গান গুলো নতুন প্রজন্মদের শেখার জন্য যখন প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজন করি তখন কুমার জানি গেয়ে ওঠে এক নাবালিকার যন্ত্রণার ব্যাখ্যা। যখন তার জীবনের শখ পূর্ণ হয়নি, তখন তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেওয়া হয়। আজকাল মানুষ বুঝতে পেরেছে হয়তো কম বয়সে মেয়ের বিয়ে দিলে সে কি কষ্টের মধ্যে দিয়ে যায়। সবাই মিলে এক সন্ধ্যায় গান গাইছিলো, ফুলের গান। কথিত আছে মহিলারা বিভিন্ন ফুলের গুনগান করে। আর সেই ফুলের গন্ধ ঘিরে ধরে কোনো এক রমণীকে। সেই গন্ধের ভরে অচৈতন্য হয়ে যায় মেয়েটি।
কন্ধাদের সাথে দেখা হলো খেজুরিপুট গ্রামে। এটা জানা যায় এখানে এককালে অনেক খেজুর গাছ ছিল। কন্ধাদের বিয়ের প্রথা বেশ অন্যরকম। ছেলেরা মেয়ে দেখতে আসে। ডুমডুমি বাজিয়ে গান হয়। একটি ডুমডুমি দিতে হয় মেয়ের বাড়িতে। যদি মেয়ের পছন্দ হয় তালে ডুমডুমি গ্রহণ করা হয়, আর না পছন্দ হলে ডুমডুমি ফেরত দিয়ে দেওয়া হয়। ডুমডুমি একটি এক তারের যন্ত্র, লাউয়ের খোল দিয়ে বানানো হয়। এরম কত গল্প লুকিয়ে আছে। গাডাবারা যখন গোদাবরী তীর থেকে এসে লম্পটাপুট অঞ্চলে প্রথম থাকতে শুরু করে তখন চার জন বিভিন্ন গ্রামে থাকতে শুরু করে। তারপর কথিত আছে তারা প্রচণ্ড ভূতের ভয়ে একসাথে থাকতে শুরু করে।।এবং ধীরে ধীরে তাদের সংসার বিস্তার করে। আবার গাডাবা জাতি এখন একটা নতুন ধর্ম পালন করে। যাকে বলে আলেখ ধর্ম। সেখানে সবাই খায় নিরামিষ খাবার। এটাই এক অদ্ভুত সহবাস। তবে সব জনজাতির প্রধান দেবী হুন্ডি মাতা। তারা পুজো করে প্রকৃতিকে। দুরুয়াদের গ্রাম কেন্ডুগুদা। কেন্দু গাছের সারি এই গ্রামে। সেখান থেকেই নাম কেন্দুগুদা। তাদের নাচের নাম বিরলি নাচ। এখানে কাঠি ব্যবহার করে এক এক জন এক একজনের সাথে কাঠীর আঘাত আদান প্রদান করে ঘুরে ঘুরে। আমি ঘুরে বেড়িয়েছি বিভিন্ন গ্রামে।
কোটপাড ছোট টাউন। এখানে মিরগান সম্প্রদায়ের মানুষ প্রধানত বুনন করে শাড়ি, দুপাট্টা, আর থান। টাউন এর লোকেরা ছাড়াও আশপাশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রাম যেমন ভানসুলি, ডংরিগুডায় তৈরি হয় কোটপাড শাড়ি নামে প্রচলিত কাপড়। এই কাপড়ের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ঠ তাদের ভেষজ রং করার পদ্ধতি। আল গাছের ছাল থেকে তৈরি হয় খয়েরী এবং লাল রং। হিরাকাশি বা ফেরাস সালফেট-এর সাথে লাল রং মেশালে হয় কালো। বাকি অন্য রঙের সুতো তারা বাজার থেকে কিনে আনে। এখানকার শিল্পী পদ্মশ্রী গোবর্ধন পানিকা তার কাজের জন্য পদ্মশ্রী সম্মান পেয়েছেন।
সুবাই নামে এক ছোট্ট গ্রাম। সেখানে পাওয়া গেছে পঞ্চম শতাব্দীর জৈনদের মন্দির। পাঁচটি মন্দির এখানে অবস্থান করে। মন্দির বলতে এখানে প্রসিদ্ধ শিব মন্দির, গুপ্তেশ্বর মন্দির। বইপাড়িগুডায় অবস্থিত ন্যাচারাল লাইমস্টোন দিয়ে তৈরি গুহা এবং শিবলিঙ্গ। কথিত আছে রাম তার বনবাসের সময় এক শিবলিঙ্গ খুঁজে পায়। রাম অবশ্য বনবাস জীবন বোধহয় ভারতের সব প্রান্তেই কাটিয়েছিলেন। পাশেই সবরি নদী এবং তার অন্যদিকে ছত্তিশগড়। মানুষ এখানে বেড়াতে আসে খুব কম। শীতকালে কিছু মানুষ আসে। পরব নামে এখানে বিশাল মেলা হয় নভেম্বরে। সেই সময়ে অনেক মানুষ আসে ওডিশার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। শীতেও মানুষ আসে। তবে এখনও বিশাল হোটেল দিয়ে জায়গার সৌন্দর্য নষ্ট হয়নি। প্রকৃতি বেঁচে আছে, পাখি গান গায়, দেওমালি পাহাড়ের চূড়ায় নিস্তব্ধতা, ডুডুমার ঝর্নার শব্দ শোনা যায় অনেক দূর থেকে। কে যেন বাঁশী বাজায়। বাঁশি এখানকার আদিবাসীদের তাল ও ছন্দের যন্ত্র। এখানে বলে মোহুড়ি। তালবাদ্য অনেক রকমের, ঢোল, তিরিবিড়ি, ধাপ এর মধ্যে প্রধান। কাকরিগুমায় এক দল মানুষ তালবদ্য বানায়। সেখান থেকেই বিভিন্ন নাচ গান দলের শিল্পীরা কিনে নিয়ে যায়। আর তাদের গ্রাম থেকে একটু দূরেই আছে পুঞ্জাসিল জলপ্রপাত, তেলিমাটিং জলপ্রপাত। একটা বিকেল ঝর্নার ধারে বসে কাটানোর ইচ্ছে আছে। যেখানে কবিতারা ভেসে আসে অবলীলায়। এক রমণী, তার পা ডুবিয়ে বসে থাকে, স্বপ্ন দেখে বিদেশ পারি দেওয়ার।
দিশারী আছে সব গ্রামে। অল্পবিস্তর অসুখ হলে তারাই ওষুধ দেয়। গাছের শিকড়, ছাল, শাখা, পাতা, ফুল থেকে তৈরি হয় সে ওষুধ। বংশপরম্পরায় এই ওষুধ বানানোর শিক্ষা এক জন্ম থেকে আর এক জন্মে পৌঁছে যায় অনায়াসে। পৌষ পার্বণ, চৈত্র উৎসবে এরা বেশ আনন্দে মেতে ওঠে। পৌষ পার্বণকে এরা পুষপুনি বলে থাকে। এই সময় নাচ গান, ভালো মন্দ খাওয়া, সুরা পান চলতে থাকে গ্রামে গ্রামে। বিভিন্ন রকমের সাজে মানুষ বেরিয়ে পড়ে। কেউ রাজা, কেউ রাবণ, কেউ রাম সাজে। কেউ কেউ বিভিন্ন জন্তুর সাজেও বেরোয়। একটি শোভাযাত্রা বেরোয়, বাজনা বাজে, গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়।
বাড়ি বানানোর আদল এক এক জনজাতির এক এক রকম। দুরুয়াদের বাড়ির চারিধারে কাঠের পাটাতন দিয়ে ঘেরা থাকে। কিছু জনজাতির বাড়ি চৌকো আকারের, কারো বা গোলাকার। মাটির বাড়ির ছাঁদ বেশির ভাগ আসবেস্টাসের, কিছু বাড়ির টাইলস দেওয়া। কন্ধাদের বাড়িগুলো সারী দিয়ে একের পর এক। আর প্রত্যেক বাড়ির দেওয়ালের রং আলাদা। এক অদ্ভুত রঙের মেলা দেখা যায়। প্রত্যেক জনজাতির মেয়েরা বিভিন্ন ফলের বীজ দিয়ে তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের গয়না। দুরুয়ারা সিয়ালি গাছের ফল থেকে তৈরি করে মালা। এরম ব্যবহার হয় আরও অনেক গাছের বীজ, বেশিরভাগ জঙ্গলি গাছ। তারা যখন বিভিন্ন রঙের শাড়ী পড়ে দলবদ্ধ হয়ে নাচে বাদ্যযন্ত্রের তালে তখন তৈরি হয় এক অনন্য পরিবেশ। নাকে তাদের বিশাল নোলক, কানে দুল, পায়ে হাতে বালা, সব মিলিয়ে এক অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য। অনেকবার কোরাপুট গেছি, প্রতিবার নতুন কিছু দেয় এখানকার প্রকৃতি, মানুষ, আর জনজাতির সংস্কৃতি। ভিজিয়ানগরম বা বিশাখাপটনাম অব্দি ট্রেনএ এসে সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় সহজেই বা সোজা হাওড়া থেকে ট্রেনে কোরাপুট। একবার ঘুরে যান মায়াবী কোরাপুট।।
Author : Siddhanjan Ray Chaudhuri